মানবিক ডিসি জাহিদুল ইসলাম এর আদর, ভালবাসা, উপহার ও ঈদ সেলামি পেয়ে উচ্ছ্বসিত অনাথ শিশুরা
এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ :
ঈদের দিনের সকালটা ছিল অন্যরকম। চট্টগ্রামের একটি সরকারি শিশু প্রতিষ্ঠানের ছোট্ট আঙিনায় হঠাৎ করেই জমে ওঠে এক অদ্ভুত আনন্দ উচ্ছ্বাস। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ দৌড়ে এগিয়ে আসছে, কেউবা দূর থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে—“আজ কী হচ্ছে?”
যাদের জীবনে ঈদ মানেই নীরবতা, সীমিত আয়োজন আর অভাবের এক চাপা অনুভূতি—সেই শিশুদের জন্য এই দিনটি হয়ে উঠল একেবারেই ব্যতিক্রম। কারণ, সেদিন সেখানে শুধু একজন কর্মকর্তা যাননি—গিয়েছিলেন একজন মানবতার কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ মানবিক ডিসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা ঈদের দিনে তার পরিবারকে একান্ত সময় না দিয়ে ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়েই এসে দাঁড়িয়েছিলেন ঠিক এই শত শত শিশুদের মাঝখানে—যাদের অনেকেরই নেই বাবা-মায়ের স্নেহময় স্পর্শ।তারপরেও আজ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে টেবিলের ওপর সাজানো ফল, মিষ্টি, চকলেট, আর পাশে স্তূপ করে রাখা তরমুজ—সবকিছু যেন অপেক্ষা করছিল ছোট ছোট হাতগুলোর জন্য।তারা এইগুলি দেখে অনেক আনন্দিত হয় শিশু বাচ্চারা। এরপর
যখন জেলা প্রশাসক নিজ হাতে শিশুদের মাঝে ঈদের সালামি তুলে দিতে শুরু করলেন, তখন দৃশ্যটি হয়ে উঠল একেবারেই আবেগঘন। একটি শিশু দু’হাত দরে টাকা নিয়ে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে—হয়তো এই প্রথম সে নিজের নামে ঈদের সালামি পেল। আরেকজন নতুন জামা বুকে জড়িয়ে ধরে আছে, যেন এটি তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। হাসির শব্দ, হাততালি আর আনন্দের উচ্ছ্বাসে মুহূর্তেই বদলে গেল পুরো পরিবেশ।
১৭১ জন মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু—যাদের অনেকেরই বাবা-মা আছে, কিন্তু নেই কোনো খোঁজ। আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উপলব্ধির আশ্রয়ে বড় হচ্ছে, হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ের ভার নিয়ে আরো ৮৪ জন কন্যাশিশু।
সরকারি ছোট মনি নিবাসে আশ্রয়ে রয়েছে ১৬টি ছোট্ট প্রাণ—যাদের পরিচয় পর্যন্ত অজানা, যারা বিভিন্ন সময় হারিয়ে গিয়ে পুলিশের মাধ্যমে আশ্রয় পেয়েছে। তারা কেউ জানে না তাদের শিকড় কোথায়।
এই শিশুদের কাছে ঈদ মানে সাধারণত অন্যদের আনন্দ দূর থেকে দেখা। কিন্তু এবার সেই দূরত্ব ভেঙে দিল একটি উদ্যোগ—একজন মানবতার ফেরিওয়ালা মানবিক জেলা প্রশাসকের আন্তরিকতায়। জেলা প্রশাসকের এই সফরে কোন আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।
তিনি শিশুদের পাশে বসেছেন, কথা বলেছেন, তাদের হাসির সঙ্গে নিজেও হেসেছেন। খাবারের মান পরীক্ষা করেছেন, পরিবেশ দেখেছেন—কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু করেছেন—তিনি চেষ্টা করেছেন তাদের অনুভব করতে। কারণ, এই শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় অভাব হয়তো খাবার বা পোশাক নয়—বরং একটি আপন মানুষের উপস্থিতি।
এই প্রতিষ্ঠানের হাউজ প্যারেন্ট এনামুল হক, যিনি আটাশ বছর ধরে এখানে কর্মরত, এই অভিজ্ঞতাকে ব্যতিক্রমী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমি এই দুই যুগেরও বেশি সময়ের মধ্যে কখনো দেখিনি একজন ডিসি ঈদের দিন এখানে এসে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। তিনি প্রতিটি শিশুকে নিজের হাতে ঈদের সালামি দিয়েছেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।”
সরকারি শিশু পরিবারের ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট তাসনিম আক্তার বলেন, “ডিসি স্যার আমাদের প্রতিটি শিশুকে সরাসরি নিজে হাতে ঈদের সালামি দিয়েছেন। তিনি শিশুদের বিষয়ে খুবই আন্তরিক। শিশুরা ডিসি স্যারকে ঈদের দিন পেয়ে খুবই খুশি। এতিম ও দুস্থ এই শিশুরা ডিসি স্যারের কাছ থেকে ঈদ সালামি পেয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত। ডিসি স্যার শিশুদের জন্য মিষ্টি ও বিভিন্ন সুস্বাদু ফল নিয়ে এসেছিলেন।”
ছোট মনি নিবাসের অফিস সহকারী নূর জাহান আবেগভরে বলেন, “আমাদের এখানে ১৬ জন শিশু আছে, যারা বিভিন্ন সময় হারিয়ে গিয়েছিল। পরে পুলিশের মাধ্যমে এখানে আশ্রয় পেয়েছে। আমরা কখনো ভাবিনি জেলা প্রশাসক ঈদের দিনে পরিবারের সঙ্গে সময় না দিয়ে আমাদের এখানে পরিদর্শনে আসবেন। শিশুরাও কখনো কল্পনা করেনি তাদেরকে ডিসি স্বয়ং এসে ঈদের সালামি দেবেন। ডিসি স্যারকে পেয়ে আমরা আজ দারুণ খুশি।”
ঈদের এই মানবিক সফর থেমে থাকেনি শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানে। হারিয়ে যাওয়া অনাথ শিশুদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘উপলব্ধি’তেও গিয়েছিলেন জেলা প্রশাসক।
এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এম সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমি গত ১৩ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। আজ ঈদের দিনে ডিসি মহোদয় যেভাবে পুরো ডিসি কার্যালয়ের প্রায় সব কর্মকর্তাকে এখানে উপস্থিত করেছেন, তা আমাকে দারুণভাবে আবেগাপ্লুত করেছে। এত ব্যস্ত সময়ের মাঝেও তাঁরা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন—এটি আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের এই শিশুরা এতে অনুপ্রাণিত হবে। তাঁরা প্রত্যেকটি শিশুকে ঈদ মোবারক জানিয়েছেন এবং ঈদি দিয়েছেন, যা তাদের জন্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।”
তিনি আরও বলেন, “এখানে থাকা শিশুরা কোনো না কোনো সময় হারিয়ে গিয়েছিল এবং পুলিশের মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে। ফলে তারা পারিবারিক পরিবেশ খুব কমই পায়। এভাবে কেউ কখনো তাদের ঈদি দেয়নি। এটি যেমন আমার কাছে আবেগাপ্লুত একটি বিষয়, তেমনি তাদের কাছেও একটি নতুন অভিজ্ঞতা।”
পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসকের কণ্ঠে ছিল এক গভীর উপলব্ধি। তিনি বলেন, “আমরা আজ ঈদের দিনে অনেক আনন্দ পেয়েছি। ঈদ মানেই সবার জন্য আনন্দ। আজ আমরা সবাইকে নিয়ে এখানে এসেছি, আর সবার খুশি দেখে আমরা খুবই আনন্দিত হয়েছি। ঈদ মানে হাসি, ঈদ মানে খুশি। আমরা সবার মুখে হাসি দেখতে চাই।”
উপলব্ধি প্রতিষ্ঠানে তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “ঈদ উৎসব উদ্যাপনের জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকি। কিন্তু আজ ‘উপলব্ধি’ নামক এই সংগঠনটিতে এসে, এই শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে, আমি নতুনভাবে ঈদের আসল আনন্দ উপলব্ধি করতে পেরেছি। আজ যখন আমি এখানে এলাম এবং বাচ্চারা আমাকে গান শুনিয়েছে, তখন তাদের আনন্দ দেখে আমরাও গভীরভাবে আনন্দিত হয়েছি। আজ মনে হলো—ঈদ সত্যিই একটি আনন্দের উৎসব, আর সেই আনন্দ আমরা এখানে এসে সরাসরি অনুভব করতে পেরেছি। আমাদের পুরো দিনটি অত্যন্ত সুন্দর কেটেছে, এবং আজ আমরা যেন ঈদের পূর্ণ আনন্দটুকু অর্জন করতে পেরেছি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতে এই শিশুরা আরও সুন্দরভাবে ঈদ উদ্যাপন করবে। আমরা চাই তাদের সবার মুখে হাসি ফুটুক। কারণ ঈদের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আজ আমরা সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এখানে এসেছিলাম—এই শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে। তারা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের গ্রহণ করেছে এবং অনেক আনন্দ পেয়েছে। এ কারণেই আজকের এই ঈদের আয়োজনটি সার্থক হয়েছে।”
এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই শিশুদের দেখাশোনা করছেন, তাদের প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা রইল।”
এক দিনের ভালোবাসা, দীর্ঘ দিনের প্রভাব। ঈদের এই ক্ষণিক আনন্দ হয়তো একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এই দিনের স্মৃতি—একজন মানুষের ছোঁয়া, একটি নতুন জামা, এক মুঠো সালামি, আর অনেকগুলো ভালোবাসার মুহূর্ত—এসব কিছু রয়ে যাবে এই শিশুদের মনে অনেকদিন।
সবচেয়ে অবহেলিত এই শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম প্রমাণ করেছেন—প্রশাসন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, এটি হতে পারে মানবিকতার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ঈদের আনন্দ যখন ভাগ হয়ে যায়, তখনই তা পূর্ণতা পায়। আর সেই পূর্ণতার গল্পই লিখে গেল চট্টগ্রামের এই দিনটি—একজন কর্মকর্তা নয়, একজন মানবিক মানুষের গল্প হয়ে।